Home / বিশ্ব / লাইবেরিয়ায় ‘কুশ’ মাদকের ভয়াবহ থাবা: ধ্বংসের মুখে তরুণ প্রজন্ম, আড়ালেই থেকে যাচ্ছে গডফাদাররা

লাইবেরিয়ায় ‘কুশ’ মাদকের ভয়াবহ থাবা: ধ্বংসের মুখে তরুণ প্রজন্ম, আড়ালেই থেকে যাচ্ছে গডফাদাররা

পশ্চিম আফ্রিকার দেশ লাইবেরিয়ার রাজধানী মনরোভিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় সিন্থেটিক মাদক ‘কুশ’-এর ভয়াবহ বিস্তার ঘটেছে। স্থানীয় ভুক্তভোগী পরিবার এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই মারাত্মক মাদকাসক্তি তরুণদের স্কুল ও পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাস্তায় ছুড়ে ফেলছে, যা দেশটিতে এক চরম সামাজিক ও স্বাস্থ্য সংকট তৈরি করেছে। অথচ এই মাদক ব্যবসার পেছনে থাকা মূল চোরাকারবারিরা এখনও অধরাই থেকে যাচ্ছে।

লাইবেরিয়ায় কুশ এখন অন্যতম প্রধান জনস্বাস্থ্য উদ্বেগ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। প্রতিবেশী সিয়েরা লিওনে প্রথম এই মাদকের প্রাদুর্ভাব দেখা গেলেও, তা দ্রুত লাইবেরিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে অসংখ্য অভিভাবক তাদের সন্তানদের মাদকাসক্ত হয়ে পড়তে এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে লড়াই করতে দেখছেন।

মিয়াতা পেয়ে নামের এক স্থানীয় মায়ের কাছে এই সংকট কেবল কোনো পরিসংখ্যান নয়, এটি তার নিজের ছেলের জীবনের নির্মম বাস্তবতা। তিনি আল জাজিরাকে জানান, ২০১৮ সালে দশম শ্রেণিতে পড়ার সময় তার ছেলে প্রথম কুশের সংস্পর্শে আসে।

ছেলের চিকিৎসার জন্য মিয়াতা দুই দফায় পুনর্বাসন কেন্দ্রে ৮০ ডলার এবং ২৫ কেজি চাল পরিশোধ করেন, যা তাদের মতো দরিদ্র পরিবারের জন্য জোগাড় করা অসম্ভব ছিল। তিনি আশা করেছিলেন তার ছেলে সুস্থ হয়ে উঠবে, কিন্তু প্রতিবারই চিকিৎসার পর সে আবার মাদক আস্তানায় ফিরে গেছে। অত্যন্ত ক্ষোভ ও দুঃখ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “এই জিনিসটা আমাদের সন্তানদের শেষ করে দিচ্ছে। আমার হৃদয় রক্তাক্ত হচ্ছে।”

লাইবেরিয়া সরকার ২০২৪ সালে মাদক অপব্যবহারকে একটি জরুরি জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি হিসেবে ঘোষণা করে। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে এই জরুরি অবস্থা অনেক আগে থেকেই ঘরের দরজায় কড়া নাড়ছে।

মাদকের থাবায় জীবন বিপর্যয়

মিয়াতা পেয়ে-র মতো অবস্থা লাইবেরিয়ার অসংখ্য পরিবারের। মাদকের আসক্তিতে অনেক তরুণ পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে রাস্তায় বসবাস শুরু করেছে, যাদের স্থানীয়ভাবে ‘জোগোস’ বলা হয়।

২৬ বছর বয়সী আব্রাহাম জ্যাকসন তাদেরই একজন। তিনি ১৬ বছর বয়স থেকে কুশ সেবন করছেন। জ্যাকসন জানান, তার মা মারা যাওয়ার পর বাবা তাকে পরিবার থেকে বের করে দেন। ফলে আশ্রয় ও সহায়তাহীন অবস্থায় তিনি রাস্তায় মাদকাসক্ত হয়ে পড়েন। তার গল্পটি দেখায় কীভাবে আসক্তি দারিদ্র্য ও গৃহহীনতাকে আরও বাড়িয়ে তোলে।

আক্রান্তদের পুনর্বাসনের সুযোগও দেশটিতে অত্যন্ত সীমিত। মনরোভিয়া থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে বেনটোল সিটিতে সরকারি পুনর্বাসন কেন্দ্রটি এখনও অসমাপ্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। ফলে অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে অনিবন্ধিত ও নিম্নমানের বেসরকারি পুনর্বাসন কেন্দ্রের শরণাপন্ন হচ্ছে।

নেপথ্যের বিশাল মাদক ব্যবসা

লাইবেরিয়া ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট এজেন্সির (এলডিইএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ২২ জুনের মধ্যে মাদক পাচারের অভিযোগে ১,১৬৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে এই দীর্ঘ সময়ে আদালতে মাত্র ৮ জনের সাজা নিশ্চিত করা গেছে। অর্থাৎ প্রতি ১৪৬ জন গ্রেপ্তারে মাত্র ১ জনের সাজা হয়েছে।

এই পরিসংখ্যান ইঙ্গিত করে যে, বিচার ব্যবস্থা মূলত চুনোপুঁটিদের গ্রেপ্তার করতে পারলেও এই ব্যবসার মূল হোতা এবং অর্থদাতাদের স্পর্শ করতে পারছে না।

এরই মধ্যে দেশটিতে বড় ধরনের দুটি কোকেনের চালান জব্দ করা হয়েছে। জুনে রবার্টস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে প্রায় ১৯.২ মিলিয়ন ডলার মূল্যের ২৩৭.৬ কেজি কোকেন উদ্ধার করা হয়, যা খাদ্য উপকরণ ও কাপড়ের বাক্সে লুকানো ছিল।

এর কয়েক সপ্তাহ পর দুয়াজনে একটি গুদাম থেকে প্রায় ৩১৭ মিলিয়ন ডলার মূল্যের চার টন কোকেন জব্দ করে পুলিশ, যা দেশটির ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মাদকের চালান। এই বিপুল পরিমাণ মাদকের চালান প্রমাণ করে যে, স্থানীয় তরুণরা যখন রাস্তায় কুশ নিয়ে ধুঁকছে, তখন আন্তর্জাতিক চোরাচালান চক্র লাইবেরিয়াকে ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করছে।

চোরাকারবারিদের কৌশল বদল

এলডিইএ-র তথ্যমতে, ২০২৫ সালের তুলনায় ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে কুশ জব্দের পরিমাণ দ্বিগুণ হয়ে ১৬৬.৮৮ কেজিতে দাঁড়িয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে প্রায় ৩৮ শতাংশই বিদেশি নাগরিক, যারা প্রধানত আইভরি কোস্ট, গিনি, নাইজেরিয়া এবং সিয়েরা লিওনের বাসিন্দা।

একই সাথে ট্রামাডল নামক একটি ব্যথানাশক নিষিদ্ধ করার পর চোরাকারবারিরা দ্রুত ট্যাপেন্টাডল নামের আরেকটি মাদকের সরবরাহ বাড়িয়ে দিয়েছে। তদন্তকারীরা বলছেন, চোরাকারবারিরা আইনের কড়াকড়ির সাথে দ্রুত নিজেদের মানিয়ে নেয়।

কমিউনিটি পর্যায়ে লড়াই

মাদকের এই ধ্বংসাত্মক প্রভাব শুধু ব্যবহারকারীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। স্থানীয় কমিউনিটি লিডার থমাস ওয়েসেহ জানান, তারা পুলিশকে মাদক আস্তানাগুলো চিহ্নিত করতে সাহায্য করেন। কিন্তু অভিযানের দুদিন পরেই মাদক ব্যবসায়ীরা আবার ফিরে এসে তাদের হুমকি দেয়। তার নিজের ছেলেও মাদকাসক্ত হয়ে এখন একটি কবরস্থানে বসবাস করছে।

সরকার সীমান্তে কড়াকড়ি, সম্পদ বাজেয়াপ্তকরণ এবং পুনর্বাসন সেবা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিলেও ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর প্রশ্ন, আসল অপরাধীরা কবে আইনের মুখোমুখি হবে? ভুক্তভোগী মিয়াতা পেয়ে বলেন, “তারা শুধু সেবনকারীদের ধরছে, কিন্তু যারা এগুলো দেশে আনছে, তাদের কিছুই হচ্ছে না।”

Tagged:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *