গ্রিসের ২৮ বছর বয়সী জুয়েলারি ডিজাইনার কনস্ট্যান্টিনা মাক্রিডাকিস ছোটবেলা থেকেই মানুষের কণ্ঠস্বর ও নামের স্বাদ অনুভব করতে পারেন। নিজের বাবার নাম নিকোলাসকে তার কাছে ক্যারামেল দেওয়া চকলেটের মতো মনে হয় এবং মায়ের নাম মারিয়া মনে হয় চিংড়ি দিয়ে রান্না করা পাস্তার মতো। মাক্রিডাকিসের মতে, এটি তার কাছে স্বাভাবিক মনে হতো কারণ কথা বলার সময় মুখ থেকে শব্দ বের হয়, তাই সেটি স্বাদের সাথে যুক্ত থাকাটা তার কাছে যুক্তিসঙ্গত ছিল। বড় হওয়ার পর এক তথ্যচিত্র দেখার মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন এটি মূলত সিনেসথেসিয়া নামক একটি স্নায়বিক অবস্থা।
সিনেসথেসিয়া কী
সিনেসথেসিয়া এমন একটি উপলব্ধি বা স্নায়বিক ঘটনা, যেখানে একটি ইন্দ্রিয় উদ্দীপিত হলে অন্য একটি ইন্দ্রিয় স্বয়ংক্রিয়ভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে। গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২ থেকে ৪ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনোভাবে এই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন। অনেকে নিজের এই বিশেষ ক্ষমতার বিষয়টি সারা জীবনেও বুঝতে পারেন না। প্রখ্যাত গায়িকা বিলি আইলিশ সপ্তাহের বিভিন্ন দিনকে আলাদা আলাদা রঙ ও সংখ্যার সাথে মেলাতে পারেন। এছাড়া ইতিহাস থেকে জানা যায়, হাঙ্গেরিয়ান সুরকার ফ্রাঞ্জ লিস্ট সুরের মধ্যে রঙের আভা অনুভব করতেন।
বিজ্ঞানীদের পর্যবেক্ষণ
সুইডেনের ক্যারোলিনস্কা ইনস্টিটিউটের নিউরোডেভেলপমেন্টাল ডিসঅর্ডার সেন্টারের গবেষক ইয়ানিনা নিউফেল্ড জানান, মানুষের মস্তিষ্ক ভিন্নভাবে কাজ করে। একটি তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা অনুযায়ী, শৈশবে স্নায়বিক সংযোগের বিন্যাস বা ‘সিন্যাপটিক প্রুনিং’ প্রক্রিয়ায় সিনেসথেসিয়া আক্রান্তদের মস্তিষ্ক অন্যদের চেয়ে আলাদা আচরণ করে। ফলে বিভিন্ন ইন্দ্রিয় অঞ্চলের মধ্যে সংযোগ বৃদ্ধি পায় এবং মস্তিষ্কে বাড়তি উদ্দীপনা তৈরি হয়। নিউফেল্ড নিজেও স্থানিক ক্রম বা স্পেশাল সিকোয়েন্স সিনেসথেসিয়ার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন, যেখানে তিনি মানসপটে এক বছরের সময়কালকে একটি রোলার কোস্টারের মতো কল্পনা করেন।
ভিন্ন জগতের অভিজ্ঞতা
মাক্রিডাকিসের জন্য এই অভিজ্ঞতা সবসময় সুখকর হয় না। কখনো কখনো এটি তাকে অতি-উদ্দীপিত করে ফেলে। যেমন, কোনো সিনেমার চরিত্রের কণ্ঠস্বর যদি তার কাছে কমলালেবুর রসের মতো লাগে, তবে সেটি তার মনোযোগ নষ্ট করতে পারে। এমনকি মার্কিন উচ্চারণ তার কাছে কোকা-কোলার স্বাদের মতো মনে হয়, যা অনেক সময় তাকে অস্বাস্থ্যকর পানীয় পানের দিকে ধাবিত করে।
মাক্রিডাকিস মনে করেন, সিনেসথেসিয়া আমাদের শেখায় যে প্রতিটি মানুষের মন একে অপরের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। তিনি বলেন, আমরা হয়তো সবাই লাল রঙকে লালই বলি, কিন্তু আমাদের দেখার অভিজ্ঞতা ভিন্ন হতে পারে। গবেষক নিউফেল্ডও একমত যে, মানুষ পৃথিবীটাকে যে অভিন্নভাবে দেখে বলে মনে করা হয়, সিনেসথেসিয়া প্রমাণ করে যে আমাদের অভ্যন্তরীণ অভিজ্ঞতার জগত অনেক বেশি সমৃদ্ধ এবং বৈচিত্র্যময়।










